বহুজাতিক বানিজ্যিক কোম্পানীর মানবাধিকার লঙ্ঘন

ব্যবসা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বনাম মানবাধিকার ও পরিবেশ বিপর্যয় বিতর্ক নতুন নয়। বিশ্বব্যাপি বহুজাতিক বানিজ্যিক কোম্পানীর কার্যক্রম ও প্রভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে বিতর্কও বাড়তে থাকে। ১৯৭০ দশকে নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি বেসরকারীকরণ ও বৈশ্বিক বানিজ্য প্রসারে গতি বৃদ্ধি করে। সম্পদ ও পুঁজি জড়ো হতে থাকে গুটিকয় কোম্পানী ও পরিবারের হাতে। এই ধারাবাহিকতা এখনও চলমান আছে। ২০২০ সালে অক্সফামের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র ২ হাজার ১০০ জন ধনী ব্যক্তির সম্পদের পরিমান পৃথিবীর ৬০ শতাংশ বা ৪.৬ বিলিয়ন মানুষের সম্পদের সমান। এই গুটিকয় ধনী ব্যক্তিই মূলত পৃথিবীর প্রধাণ প্রধাণ বহুজাতিক কোম্পানীর নিয়ন্ত্রক। বহুজাতিক কোম্পানীর সম্প্রসারণের ফলে একদিকে পৃথিবীতে সম্পদ ও আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে; অন্যদিকে মারাত্মক মানবাধিকার লংঘনের পাশাপাশি প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র ব্যাপকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে। অথচ বহুজাতিক কোম্পানী ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় পর্যায়ে কোন আইনী কাঠামো গড়ে উঠেনি।
বহুজাতিক কোম্পানীর কার্যক্রমের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ ও বিশ্বব্যাপি বিতর্ক থাকলেও বিষয়টি জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষ প্রথম নজরে আনেন ১৯৭০’র দশকে। বহুজাতিক কোম্পানীর জন্য একটি আচরণবিধি তৈরী করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭৩ সালে ‘কমিশন অন ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশান’ গঠণ করেন। নানান বিতর্ক ও ভাঙ্গাগড়ার প্রক্রিয়ায় ১৯৯৪ সালে এই কমিশন বিলুপ্ত হয়। ১৯৯৮ সালে ‘ইউএন সাব-কমিশন অন দি প্রমোশন এন্ড প্রটেকশান অফ হিউম্যান রাইটস্‌’ বহুজাতিক কোম্পানীর বাধ্যতামূলক মানদন্ড তৈরী করার জন্য একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠণ করেন। ২০০৩ সালে এই কমিটি একটি খসড়া মানদন্ড তৈরী করলেও তা শেষ পর্যন্ত গৃহিত হয়নি। ২০০৫ সালে হাভার্ডের প্রফেসর জন রাগি’কে জাতিসংঘ মহাসচিবের মানবাধিকার ও বহুজাতিক কোম্পানীর কার্যক্রম বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ‘সুরক্ষা, সম্মান ও প্রতিকার’ শীর্ষক একটি কাঠামো হাজির করেন। যা ২০১১ সালের জুন মাসে ‘ব্যবসায় ও মানবাধিকার নির্দেশণামূলক নীতিমালা (UN Guiding Principles on Business and Human Rights)’ হিসাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয়। গৃহিত কাঠামোটি একটি স্বেচ্ছামূলক নীতিমালা হওয়ায় বিভিন্ন পক্ষের তা মেনে চলার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে বহুজাতিক কোম্পানী দরিদ্র, উন্নয়নশীল ও সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোর সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করে চরম মানবাধিকার লংঘন যেমন- নারী-শিশু ও শ্রম অধিকার লংঘন, ভূমি দখল ও পরিবেশ বিনাশী কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
এই প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে ইকুয়েডর জাতিসংঘে একটি নতুন বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তি সমাঝোতা করার আহ্বান জানায়। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক ইকুয়েডরের প্রস্তাবের পাশাপাশি একই বিষয়ে নরওয়ের উত্থাপিত একটি সমান্তরাল প্রস্তাবও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয় এবং একইসাথে একটি ‘আন্ত:সরকার উন্মুক্ত কর্মজোট’ (Inter-Governmental Working Group – IGWG) গঠণ করা হয়। এই কর্মজোট একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক চুক্তির খসড়া করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্রথম সভা আয়োজন করে। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় সভার পর ২০১৭ সালে কর্মজোটের চেয়ারপারসন খসড়া চুক্তির উপাদানসমূহ হাজির করেন। ২০১৮ সালের জুন মাসে সমাঝোতা চুক্তির একটি খসড়া প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালে উন্মুক্ত কর্মজোট সমাঝোতা চুক্তির সংশোধিত খসড়া হাজির করে। ২০২০ সালে উন্মুক্ত কর্মজোট সরকার ও নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে বেশ কয়েকটি পরামর্শ সভার মাধ্যমে মতামত গ্রহণ করে। তার ভিত্তিতে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে পূণর্মূল্যায়িত দ্বিতীয় আরেকটি খসড়া প্রকাশ করে। উক্ত খসড়ার ভিত্তিতে ২০২১ সালে নাগরিক সমাজ, ব্যবসায় ও রাষ্ট্রপক্ষের সাথে একাধিক পরামর্শ সভার আযোজন করে আন্ত:সরকার উন্মুক্ত কর্মজোট। উক্ত পরামর্শ সভা থেকে প্রাপ্ত মতামত সমূহের ভিত্তিতে ৩য় খসড়া চুক্তি প্রকাশিত হয়। ৩য় খসড়া চুক্তির ভিত্তিতে ’আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, আন্তমহাদেশীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য ব্যবসায় কার্যক্রমকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইনী চুক্তি প্রণয়নের লক্ষে বহুপক্ষীয় সমাঝোতা সভা অনুষ্ঠিত হচেছ। এই সভা চলবে ২৫ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।